দীর্ঘদিন ধরেই সুশাসনের ঘাটতি ও ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণের সংকট মোকাবেলা করতে হচ্ছে দেশের ব্যাংক খাতকে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ডলার সংকট ও আমানতকারীদের আস্থাহীনতা। আবার ঋণ সহায়তার শর্ত হিসেবে সরকারের ওপর খাতটি সংস্কার নিয়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) চাপও রয়েছে। এর ওপর দেশের ব্যাংক খাতের ঋণমানকে সম্প্রতি ‘স্থিতিশীল’ থেকে ‘নেতিবাচক’ মানে নামিয়ে এনেছে আন্তর্জাতিক ঋণমান সংস্থা মুডি’স ইনভেস্টর সার্ভিস।
বহুমুখী এ জটিল পরিস্থিতি সামনের দিনগুলোয় দেশের ব্যাংক খাতকে বড় ধরনের চাপে ফেলতে যাচ্ছে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের। আবার ব্যাংকগুলোর এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবেলায় সক্ষমতা নিয়েও দেখা দিয়েছে বড় ধরনের সংশয়।
দেশে এখন বাংলাদেশ ব্যাংকের লাইসেন্স নিয়ে কার্যক্রম চালাচ্ছে ৬১টি ব্যাংক। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংক আছে নয়টি। বেসরকারি খাতের ব্যাংকের সংখ্যা ৪৩। এসব ব্যাংক গড়ে উঠেছে ব্যবসায়ী, পেশাজীবী ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্যোগে। এর মধ্যে ১০টি ব্যাংকিং কার্যক্রম চালাচ্ছে পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ধারায়। এর পাশাপাশি দেশে কার্যক্রম রয়েছে নয়টি বিদেশী ব্যাংকেরও।
মুডি’সের ঋণমানে অবনমনের বিষয়টিকে দেশের ব্যাংক খাতের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, এর ফলে দেশের ব্যাংকগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক লেনদেন আরো কঠিন ও ব্যয়বহুল হয়ে উঠবে। এরই মধ্যে বেশকিছু আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর জন্য ক্রেডিট লিমিট কমিয়ে দিয়েছে। সম্প্রতি দুবাইভিত্তিক মাশরেক ব্যাংক এবং স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের হংকং কার্যালয় দেশের দুটি ব্যাংকের ঋণপত্র (এলসি) খুলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। গত বছরের ডিসেম্বরে মুডি’স জানিয়েছিল, তারা বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদে বিএ৩ রেটিংটি পর্যালোচনা করছে। প্রতিষ্ঠানটি দেশের বেসরকারি খাতের সাতটি ব্যাংকের রেটিংও পর্যালোচনার কথা জানিয়েছে। এরই মধ্যে দেশের একটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের ঋণমান অবনমন করেছে মুডি’স। সব মিলিয়ে মুডি’সের রেটিংয়ের প্রভাব দেশের ব্যাংক খাতে আরো দীর্ঘায়িত হবে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, এ চাপ মোকাবেলা করতে গিয়ে দেশের ব্যাংকগুলোকে আগামীতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হবে।
একাধিক ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে বলেন, বহু আগে থেকেই দেশের ব্যাংক খাতে সুশাসনের ঘাটতি চলছে। সরকারি-বেসরকারি অনেক ব্যাংকে শৃঙ্খলা বলে কিছু নেই। চেয়ারম্যান কিংবা প্রভাবশালী পরিচালকরা পুরো ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ করছেন। এ কারণে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বাড়ছে। কয়েকটি ব্যাংকের ঋণ কেলেঙ্কারির সংবাদ গ্রাহকদের আতঙ্কিত করে তুলছে। এ পরিস্থিতিতে মুডি’সের ঋণমান অবনমন আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের ব্যাংক খাত নিয়ে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করবে। এতে ব্যাংকের আমদানি-রফতানিসহ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কমিশন বেড়ে যাবে। একই সঙ্গে বৈদেশিক বাণিজ্যও হুমকিতে পড়তে পারে।
সুশাসনের ঘাটতি ও ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণকে এখন দেখা হচ্ছে দেশের ব্যাংক খাতের দুষ্টচক্র হিসেবে। ব্যাংক পরিচালনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের আইন-কানুন ও বিধিমালা থাকলেও অনেক ক্ষেত্রেই এর ব্যত্যয় ঘটতে দেখা যায়। ব্যাংক কার্যক্রম পরিচালনায় পর্ষদ সদস্যদের অনৈতিক হস্তক্ষেপ, প্রভাব খাটিয়ে নিজ ব্যাংক থেকে পরিচালকদের বড় অংকের ঋণ নেয়া, এক ব্যাংকের পরিচালকের অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়া, নীতিমালার ব্যত্যয় ঘটিয়ে ঋণ প্রদান, পর্যাপ্ত জামানত ছাড়াই ঋণ প্রদান, ভুয়া নথিপত্র জমা দিয়ে ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়ার মতো অনেক নজির রয়েছে। সুশাসনের এ ঘাটতিকেই এখন ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ার বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এ মুহূর্তে ব্যাংক খাতে সুশাসনের ওপর নজর দেয়ার কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, ব্যাংক খাতে সুশাসনের ওপরই নজর দিতে হবে সবচেয়ে বেশি। যদিও ব্যাংকগুলোয় এখন সুশাসনের ঘাটতিই প্রকট হয়ে উঠছে। ঋণখেলাপিদের ওপর কঠোর না হয়ে অনেক ক্ষেত্রেই ছাড় দেয়া হচ্ছে। এটিই এ মুহূর্তে দেশের ব্যাংক খাতের জন্য সবচেয়ে বড় চাপ। এসব বিষয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ছাড়া ব্যাংক খাতের ঝুঁকি কমানো যাবে না।
গত বছরের ডিসেম্বর শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ২০ হাজার ৬৫৭ কোটি টাকা। তবে খেলাপির তুলনায় ব্যাংকগুলোর দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের পরিমাণ চার গুণ বেশি। বর্তমানে ব্যাংক খাতে খেলাপি, পুনঃতফসিল, পুনর্গঠনসহ দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের পরিমাণ প্রায় সাড়ে ৪ লাখ কোটি টাকা। শুধু ২০১৭ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে পাঁচ বছরেই ব্যাংকগুলো ১ লাখ ২০ হাজার ৯৫০ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করেছে। ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, দুর্দশাগ্রস্ত এসব ঋণের বড় অংশই বেসরকারি ব্যাংক পরিচালক ও উদ্যোক্তাদের। পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে এসব ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। খেলাপি হওয়ার পর ব্যাংকাররা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পরিচালকদের ঋণই পুনঃতফসিল করছেন।
দেশের ব্যাংক খাতে বর্তমানে উদ্যোক্তাদের দ্বিতীয় প্রজন্মের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। তাদের নেতৃত্বগুণে সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংক থেকে শীর্ষ ব্যাংকে পরিণত হওয়ার উদাহরণ যেমন রয়েছে, তেমনি ভালো ব্যাংক থেকে সমসাগ্রস্ত ব্যাংকে পরিণত হওয়ার নজিরও রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যমান চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতি মোকাবেলায় ব্যাংক খাতের উদ্যোক্তাদের দ্বিতীয় প্রজন্মের প্রতিনিধিরা কেমন ভূমিকা রাখবেন সেটির ওপরও ব্যাংক খাতের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। সুশাসন নিশ্চিত করতে তারা যদি কঠোর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হন তা ব্যাংক খাতের ভবিষ্যতের জন্য ভালো হবে। কিন্তু সুশাসন নিশ্চিত করতে না পারলে খাতটিকে সামনের দিনগুলোয় আরো সংকটের মুখোমুখি হতে হবে।
পরিচালকদের হস্তক্ষেপে করপোরেট সুশাসন ভেঙে পড়ার বড় একটি নিদর্শন হিসেবে দেখা হয় ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেডকে। গত এক যুগে প্রথম প্রজন্মের বেসরকারি ব্যাংকটির প্রায় সব ব্যবস্থাপনা পরিচালকই (এমডি) চাকরির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই আকস্মিক পদত্যাগ করেছেন। কেউ কেউ শারীরিক ও মানসিক নিপীড়নের শিকার হয়েও চাকরি ছেড়েছেন। সর্বশেষ গত ১৮ জানুয়ারি ন্যাশনাল ব্যাংকের বর্তমান এমডি মো. মেহমুদ হোসেনও পদত্যাগ করেছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপে তিনি পদে ফিরেছেন। গত বছরের ডিসেম্বর শেষে ন্যাশনাল ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকায়। ব্যাংকটির বিতরণকৃত ঋণের প্রায় অর্ধেকই এখন দুর্দশাগ্রস্ত। খেলাপি ঋণের বিপরীতে ব্যাংকটির সঞ্চিতি ঘাটতির পরিমাণও ৬ হাজার ৬০০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। বড় অংকের মূলধন ঘাটতিতেও পড়েছে এক সময়ের ভালো ব্যাংক হিসেবে স্বীকৃত ন্যাশনাল ব্যাংক। আর্থিক দুর্দশার কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ন্যূনতম সিআরআর ও এসএলআর সংরক্ষণ করতেও ধারাবাহিকভাবে ব্যর্থ হচ্ছে ব্যাংকটি।
ন্যাশনাল ব্যাংকের মতোই বিপদের মুখে রয়েছে দেশের আরো অনেক ব্যাংক। ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোও এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকে সিআরআর ও এসএলআর সংরক্ষণে ব্যর্থ হচ্ছে। ব্যাংক পরিচালনায় ব্যাংকারদের অংশগ্রহণ সীমিত হয়ে যাওয়ায় এসব ব্যাংক দুর্দশায় পড়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
ব্যাংক এশিয়ার সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আরফান আলী বলেন, ‘আমাদের দেশে নতুন ব্যাংক অনুমোদনের সহজ আইন আছে। কিন্তু আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে দুর্বল ব্যাংক বিলুপ্তি বা একীভূতকরণের সুযোগ নেই। এ কারণে দেউলিয়া অবস্থায় থেকেও অনেক ব্যাংক টিকে আছে। গ্রাহকদের আমানত সুরক্ষার কথা বলে কোনো ব্যাংকই বিলুপ্ত করা হচ্ছে না। এটি আপাতদৃষ্টিতে যৌক্তিক মনে হলেও কার্যকর সুশাসনের অন্তরায়।’
তিনি বলেন, ‘নতুন ধারার ব্যাংকিং উদ্ভাবন ও স্টার্টআপের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সিলিকন ভ্যালি ব্যাংকের সুনাম ছিল। ব্যাংকটি ভালো ব্যাংক হিসেবেও সর্বজনস্বীকৃত। তার পরও ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ব্যাংকটি ধসে গেছে। এ ধসে যাওয়ার ঘটনা থেকে আমাদের শিক্ষণীয় বিষয় আছে।’
বর্তমানে দেশের ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম অনেকাংশেই আবর্তিত হচ্ছে করপোরেট ও ব্যবসা-বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে। আমদানির ঋণপত্র খোলার মাধ্যমে দেশের ব্যাংকগুলোর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আয় আসে। তবে ডলার সংকটের কারণে ব্যাংকগুলোর এ আয়ে ভাটা পড়তে শুরু করেছে। দায় মেটাতে গিয়েও এখন হিমশিম খেতে হচ্ছে ব্যাংকগুলোকে। দীর্ঘদিন ধরেই দেশে ডলারের বিনিময় হার ছিল ৮৫-৮৬ টাকা। গত বছরের এপ্রিলেও তা ছিল ৮৬ টাকার ঘরে। এর পর থেকেই শুরু হয় মুদ্রাবাজারের অস্থিরতা। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী সর্বশেষ ৭ মার্চ আন্তঃব্যাংক লেনদেনে ডলারের বিনিময় হার সর্বোচ্চ ১০৭ টাকায় উঠেছিল। গত ৬ মার্চ এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নে ১ দশমিক শূন্য ৫ বিলিয়ন ডলার আমদানি বিল পরিশোধের পর দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নেমে এসেছে ৩১ দশমিক ১৫ বিলিয়ন ডলারে। রিজার্ভ কমে যাওয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ব্যাংকগুলোয় ডলার সরবরাহ কমে সংকটের মাত্রা বাড়ার বড় আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দেশের ব্যাংক খাতের প্রতি গ্রাহকদের মধ্যে আস্থার ঘাটতি তৈরি করেছে অনিয়ম ও সুশাসনের ঘাটতি। এতে ব্যাংকগুলোয় কাঙ্ক্ষিত হারে আমানত আসছে না। ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে রয়েছে বড় অংকের নগদ অর্থ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে গত বছরের ডিসেম্বরে এর আগের মাসের তুলনায় দেশের ব্যাংকগুলোয় মেয়াদি আমানতের পরিমাণ কমেছে ১ হাজার ৮৮৩ কোটি টাকা। জানুয়ারিতে পরিস্থিতি আরো খারাপের দিকে গেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। অন্যদিকে ২০২২ সালে দেশের ব্যাংকগুলোর মেয়াদি আমানতের পরিমাণ এর আগের বছরের চেয়ে ৫ দশমিক ৬৬ শতাংশ বেড়ে ১৪ লাখ ৮৯ হাজার ১৬৯ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। যদিও এ সময়ে ব্যাংক খাতে আমানতের তুলনায় ঋণপ্রবাহের ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি হয়েছে দ্বিগুণের বেশি। গ্রাহকদের আস্থাহীনতা ফেরাতে না পারলে ব্যাংকগুলোয় তারল্য সংকট তীব্রতর হয়ে ওঠার আশঙ্কা করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
তবে যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ব্যাংক খাতের উদ্যোক্তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করতে সার্বক্ষণিক প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি) এবং এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার।
এ বছরের ৩০ জানুয়ারি আইএমএফের নির্বাহী বোর্ডের সভায় বাংলাদেশের জন্য ৪৭০ কোটি ডলার ঋণ দেয়ার প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। সাত কিস্তিতে ৪২ মাসে এ ঋণ পাবে বাংলাদেশ। এ ঋণ পাওয়ার জন্য বিভিন্ন ধরনের শর্ত পরিপালন ও সংস্কার করতে হবে বাংলাদেশকে। প্রতি কিস্তির অর্থ ছাড় করার আগে এসব শর্ত পরিপালন ও সংস্কার বাস্তবায়নের বিষয়টি পর্যালোচনা করে দেখবে আইএমএফ।
দেশের আর্থিক এবং ব্যাংক খাতের জন্যও বেশকিছু শর্ত ও সংস্কার বাস্তবায়নের শর্ত দিয়েছে সংস্থাটি। আইএমএফ মনে করছে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ক্রমবর্ধমান ও খেলাপি ঋণের উচ্চহার এবং নিম্ন মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত এ খাতের অর্থায়ন সক্ষমতাকে বাধাগ্রস্ত করবে। একই সঙ্গে সরকারের আর্থিক বোঝা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রবৃদ্ধিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
এজন্য সুশাসন, নিয়ন্ত্রণ, তদারকি ও আর্থিক ব্যবস্থার ক্ষেত্রে কাঠামোগত দুর্বলতাসহ ব্যাংকের দুর্বল পারফরম্যান্সের মূল কারণ চিহ্নিত করা, খেলাপি ঋণের ঝুঁকি মোকাবেলায় ব্যাংকের সক্ষমতা বাড়ানো, খেলাপি ঋণ কমানোয় ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করা এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ভূমিকা পুনর্মূল্যায়ন করতে বলেছে আইএমএফ। এছাড়া ঝুঁকিভিত্তিক ব্যাংকিং তদারকি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা, ব্যাংক কোম্পানি আইন এবং ফাইন্যান্স কোম্পানি আইনের সংশোধন, মুদ্রা ও বিনিময় হার নীতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংককে ইন্টারেস্ট রেট করিডোরের ব্যবস্থা নেয়া, আন্তর্জাতিক স্বীকৃত পদ্ধতি অনুযায়ী রিজার্ভের হিসাবায়ন ও বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় হারকে বাজারভিত্তিক করার উদ্যোগ গ্রহণের শর্ত দেয়া হয়েছে। ঋণ পুনঃতফসিলের সময় কমানো, ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদনে আর্থিক সম্পদ ও দায় শ্রেণীকরণের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ নিশ্চিত করা এবং ব্যালান্স শিটের দুর্বলতা কমাতেও সংস্কারমূলক উদ্যোগ নেয়ার সুপারিশ করেছে আইএমএফ। এর পাশাপাশি সংস্থাটির পক্ষ থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বচ্ছতা ও রিপোর্টিংয়ের মান বৃদ্ধি, নজরদারি ও নীতি প্রণয়নের সক্ষমতা বাড়ানো এবং বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকাশিত বার্ষিক ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্টে ব্যাংকের মন্দ ঋণ ও পুনঃতফসিল করা ঋণের তথ্য প্রকাশের কথাও বলা হচ্ছে। এসব শর্ত ও সংস্কার বাস্তবায়নও দেশের ব্যাংক খাতকে আরো চাপে ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কোনো ব্যাংক দেউলিয়া হওয়ার আশঙ্কা নেই বলে মনে করেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র মো. মেজবাউল হক। বাংলাদেশ ব্যাংকের এ নির্বাহী পরিচালক বণিক বার্তাকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে যে ব্যাংকটি দেউলিয়া হয়ে গেছে, সেটির চেয়েও দুর্বল ব্যাংক দেশটিতে রয়েছে। দুবাইয়ের একটি শক্তিশালী ব্যাংক একদিনের মধ্যে দেউলিয়া হয়ে গিয়েছিল। ব্যাংক টিকে থাকে গ্রাহকদের আস্থার ওপর। আস্থা হারিয়ে গেলে পৃথিবীর কোনো ব্যাংকই টিকে থাকতে পারে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যথাযথ ভূমিকা থাকলে কোনো ব্যাংক দেউলিয়া হওয়ার সুযোগ নেই।
আইএমএফের সুপারিশ মেনে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে দুর্বল ব্যাংক একীভূত করার কোনো উদ্যোগ নেয়া হবে কিনা জানতে চাইলে মেজবাউল হক বলেন, ‘দুর্বল ব্যাংকগুলোকে শক্তিশালী করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বাংলাদেশে জনগণের একযোগে কোনো ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নেয়ার মতো মানসিকতা নেই। গণমাধ্যমসহ সব পক্ষ দায়িত্বশীল আচরণ করলে বাংলাদেশে কোনো ব্যাংকের দেউলিয়া হওয়ার আশঙ্কা নেই।’






